কেমন ছিলো শিশু কিশোরদের চোখে নবিজি prieopathak (প্রিয় পাঠক)

কেমন ছিলো শিশু কিশোরদের চোখে নবিজি

ইসলামিক উক্তি

কেমন ছিলো শিশু কিশোরদের চোখে নবিজি

যদি এক শব্দে শিশু কিশোরদের সঙ্গে নবিজির আচার ব্যবহার তুলে ধরতে চাই, তাহলে সেই শব্দটা হবে দরদ । তরুন সাহাবি আনাস (রা.) বলেছেন-আমি শিশুদের প্রতি নবিজির চেয়ে বেশি দরদি আর কাউকে দেখিনি.

নারী ও শিশুদের তিনি কখনোই শারীরিক শাস্তি দেননি. বাবা মায়ের ভুলের জন্য কখনো কোনো ‍সন্তানকে দোষারোপ করেননি । অথচ তখনকার সমাজব্যবস্থা এমন ছিলো একজনের ভুলের জন্য গোটা পরিবার বা গোত্রকেই দায়ী করা হতো।

শুধু কি মুসলিম শিশু ? অমুসলিম, এমনকি বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে জন্ম নেওয়া শিশুদের প্রতিও ছিল তাঁর অপরিসীম দরদ। একবার এ রকম অবৈধ গর্ভধারনকারি এক নারী নবিজির কাছে এলেন নিজের দোষ স্বীকার করে ইসলামের শাস্তি মাথা পেতে নিতে। কিন্তু শাস্তি প্রয়োগ না করে নবিজি বললেন -ফিরে যাও, বুকের দুধ না ছাড়া পর্যন্ত বাচ্চাকে দুধ পান করাও।

একবার এক ইহুদি শিশুর আরোগ্য কামনায় নবিজি তাকে দেখতে গিয়েছিলেন।

আরেকবার কী হলো, এক নারীর বাচ্চা আল্লাহর রাসূলের কোলে। হঠাত বাচ্চাটা তাঁর কাপড়ে প্রস্রাব করে দিলো। এতে নবিজি মোটেও রাগ করলেন না, বিরক্তও হলেন না। শুধু কাপড়ের ওপর কিছু পানির ছিটা দিলেন। এটাই ছিল শিশুদের প্রতি নবিজির আচরণ।

বাচ্চাদের যে অপরিসীম ভালোবাসা প্রয়োজন, এটা তিনি খুব ভালোভাবেই বঝতেন। জানতেন শিশুরাও অন্যের কদর চায়, সম্মান চায়, নিগৃহীত, অবহেলিত হতে চায় না।

আনাস (রা.) বলেছেন,

‘একবার আমি বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিলাম। তখন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নবিজি (সা.) আমাদের সালাম দিলেন।

আমাদের নবিজি (সা.) মাঝেমধ্যে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে হালকা রসিকতাও করতেন। মাহমুদ বিন রাবিয়া বলছেন, ‘আমার বয়স তখন পাঁচ বছর। মনে আছে, নবিজি (সা.) একবার বালতি থেকে মুখে পানি নিয়ে মজা করে আমার মুখে ছিটিয়ে দিয়েছিলেন। ভালোলাগার বা আনন্দের স্মৃতিগুলো বাচ্চারা কখনো ভোলেনা। নবিজি জানতেন, শিশুরা চমক পছন্দ করে, উপহার পেতে ভালোবাসে। তারা মিষ্টি জাতীয় খাবার, কাপড়চোপড় ইত্যাদি জিনিস খুব পছন্দ করে। তাই মৌসুমের প্রথম ফল পাকলে যখন তার কাছে নিয়ে আসা হতো, তখন তিনি প্রথমে সেগুলোর প্রাচুর্যের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করতেন। এরপর আশেপাশের কচি-কাঁচাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তিনি উপহারগুলো সব সময় সশরীরেই দিতেন। কারণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরিতে উপহারের চেয়ে সশরীরে উপস্থিতি বেশি কার্যকর। শিশু- কিশোরদের মাঝে দায়িত্ববাধে ও আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলার জন্য মাঝে মাঝে তিনি তাদের বিশেষ কিছু কাজ করতে দিতেন। কেউ একজন তাদের ওপর আস্থা রাখছে, এটা শিশু-কিশোররা খুব পছন্দ করে। এটা তাদের দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দেয়। একবার কিশোর বয়সে আনাস (রা.)-কে এমন একটি কাজ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, যে মায়ের কাছে ফিরতে ফিরতে তার দেরি হয়ে যায়। মা জিজ্ঞেস করলেন- কী ব্যাপার? দেরি হলো কেন? আনাস বললেন- নবিজি আমাকে একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন। কী কাজ? ‘বলা যাবে না, গোপনীয়।

চিন্তা করা যায়, রাসূলের আস্থা তাকে অতটুকু বয়সে কতটা দায়িত্ববান করেছিল! কাজবাজ করতে গিয়ে বড়ো বড়ো মানুষদেরই কত ভুল হয়। সেখানে শিশু-কিশোরদের ভুল হওয়াতো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। নবিজির সময়ের শিশুরাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাদেরও ভুল হতো, তাদেরও মনে করিয়ে দিতে হতো, বাজে আচরণ শুধরে দিতে হতো। একবার এক ছেলে খেজুর গাছে পাথর ছুড়ছিল। ছেলেটিকে নবিজির কাছে আনা হলো। নবি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন ‘কীরে বাবা, খেজুর গাছে পাথর ছুড়ছ কেন?’ ‘খেজুর খেতে। ‘শোনোনা, এভাবে গাছে পাথর ছুড়তে হয় না। নিচে যেগুলো পড়ে থাকবে, সেখান থেকে খাবে। এরপর তিনি ছেলেটির মাথায় চাপড় মেরে দুআ করে বললেন| ‘আল্লাহ তোমাকে পর্যাপ্ত খাওয়ার তাওফিক দান করুন। মুহাম্মাদ -এর সততার বিষয়টি নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। তিনি শুধু নিজের ব্যাপারেই সৎ ছিলেন না, অন্যদেরও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। এমনকী বাচ্চাকাচ্চাদের যেন বাবা-মা ধোকা না দেয়, মিথ্যে না বলে, সে বিষয়েও খেয়াল রাখতেন। একবার বন্ধুদের সঙ্গে এক ছেলে খেলছিল। তার মা এসে কিছু একটা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাকে ডাকতে লাগলেন। বিষয়টা নবিজির চোখে পড়ল। মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘ওকে কী দেবেন? ‘এই তো কিছু খেজুর আর কী। ‘যদি না দেন, তাহলে কিন্তু তা আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা হিসেবে গুনাহ লেখা হবে।’ বললেন রাসূল । তিনি সত্যবাদিতার বিষয়টি ছেলেটিকে সরাসরি বললেন না বটে, কিন্তু পাশ থেকে সে ঠিকই শুনে নিল। তাই বড়ো হয়ে সে অন্যদের এই ঘটনা জানাতে ভোলেনি । এভাবে বাচ্চাদের সঙ্গে মজা করার সময়ও নবিজি কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেননি।

কিশোরদের চোখে নবি মুহাম্মাদ (সা.)

নবিজিকে সাধারণত আমরা বয়স্কদের চোখে দেখে অভ্যস্ত। সিরাত গ্রন্থগুলোতে তাকে একজন আদর্শ পুরুষ, নেতা, স্বামী ইত্যাদি বিভিন্ন ভূমিকায় দেখে থাকি। তবে একজন শিশু বা কিশোরদের চোখে তিনি কেমন ছিলেন। এ বিষয়টা খুব একটা পাওয়া যায় না।

আমরা জানি, তিনি ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। এরপর মক্কায় কাটিয়েছেন ১০ বছর। বাকি ১৩টি বছর কাটিয়েছেন মদিনায়। আমরা যখন কিশোরদের চোখে নবিজিকে দেখব, তখন তাঁর বয়স ছিল ৪০ ও ৫০-এর কোঠায়। মাদানি জীবনের শেষের দিকে তো সেটা একেবারে ৬০-এর কোঠায়। আল্লাহর রাসূলের বয়সের বিষয়টা মাথায় রাখলে শিশু- কিশোরদের সঙ্গে তার আচার-আচরণের ঘটনাগুলো সহজেই মনের চোখে দেখা সম্ভব হবে।

প্রথমেই দেখি, শিশু- কিশোরদের চোখে তাঁর মুখখানি কেমন দেখাত।

জন্মের কয়েকদিনের মধ্যেই একটি শিশু পরিচিত মুখ দেখে হাসে, আবার কারও কারও চেহারা দেখে ভয়ে কান্না করে। যার চেহারা দেখে ভালো লাগে, তার মুখ দেখে বাচ্চারা হাসে, আনন্দ পায়। ২০০৪ সালের এক গবেষণায় একটি মজার তথ্য উঠে এসেছে। এক্সেটর ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান ম্যাটারও তার সহকর্মীরা শিশুদের নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছিলেন। সে গবেষণায় মাত্র একদিনের শিশুও ছিল।

এসব বাচ্চাদের তারা জোড়ায় জোড়ায় বেশ কিছু ছবি দেখালেন। খেয়াল করলেন, দুটো ছবির মধ্যে যে চেহারাটি বেশি আকর্ষণীয়, বাচ্চারা সেটিতেই দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে আছে। তার মানে, সুন্দর-আকর্ষণীয় মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার বিষয়টি জন্মগত। আশপাশ থেকে শিখেছে- বিষয়টা এমন নয়। তো বিষয়টা যদি বাচ্চাদের ক্ষেত্রেই এমন হয়, তাহলে শিশু- কিশোরদের বেলায় এর প্রভাব আরও বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কেমন ছিলো শিশু কিশোরদের চোখে নবিজি

নবি মুহাম্মাদ (সা.) বেশ সুদর্শন ছিলেন, তাই শিশু-কিশোররা তাকে দেখে কখনোই ভয় পেত না। একটি হাদিসে তাকে ‘সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ বলেছেন একজন সাহাবি। অন্য হাদিসে আরেকজন বলছেন

‘আমি নবিজির চেয়ে সুদর্শন কাউকে কখনো দেখিনি। তার চেহারায় যেন সূর্যের ঝিলিক খেলা করে।’

তখন তো ছবি তোলার যুগ ছিল না। মানুষের ছবি আঁকাও হতো না। ইসলামপ্রচারের কারণে নবিজির নাম অনেকেই জানতেন, কিন্তু কখনো চোখে দেখা হয়নি। তো এমন একজন মানুষ একবার সাহাবি বারা বিন আজিবের কাছে জানতে চাইলেন, নবিজি দেখতে কেমন ছিলেন। তিনি বললেন‘নবিজির চেহারা কি তরবারির মতো? বিন আজিব বললেন- ‘না, চাঁদের মতো।

মজার বিষয় হলো- আরব সংস্কৃতিতে তরবারি ও চাদ দুটোই সৌন্দর্যের প্রতীক, কিন্তু অর্থের ভাবের দিক থেকে দুটোর মধ্যে চমৎকার পার্থক্য রয়েছে।

সূর্যের আলোর ঝিলিক খেলা মুখ কিংবা চাঁদের মতো কোমল চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকলে একটা বাচ্চার কেমন অনুভূতি হবে? সেই বাচ্চাই যদি আবার সুন্দর ধারাল তরবারি বা অন্য কোনো অস্ত্রের দিকে তাকায়, তখন অনুভূতি কেমন হবে? দুটো অনুভূতিই কি এক হবে? মোটেও না। এ জন্য নবিজির চেহারাকে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করেছেন সাহাবি; তরবারির সঙ্গে নয়। তার চেহারা দেখলে মনে শ্রদ্ধা জাগত; আতঙ্ক নয়। চোখ যেন শান্তি খুঁজে পেত। কোনো কোনো ঘটনায় দেখা যায়- তিনি যদি নীরবও থাকতেন, তবুও তাঁর মুখভঙ্গি বিভূতি ছড়াত, তাঁকে দেখে মনে সম্রম জাগত।

নবিজি যখন দেশান্তর হয়ে মদিনায় এসেছেন। অনেকেই দেখতে আসছেন তাঁকে। কৌতূহলবশে এক ইহুদি পণ্ডিতও এসেছেন। বহুদিন পরে তিনি সেই ঘটনার কথা এভাবে বলেছিলেন| ‘লোকদের সঙ্গে আমিও তাঁকে দেখতে গেলাম। তাঁর চেহারা দেখেই বুঝলাম, এই চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর হতে পারে না। লোকটি কিন্তু তখনও অমুসলিম! তার ওপর ভিন্ন ধর্মের পণ্ডিত! কেবল একবার নবিজির দিকে তাকাতেই তিনি যে অনুভূতিতে দ্রবীভূত হয়েছিলেন,

তাতে নিশ্চিত হয়েছিলেন- কোনো ভণ্ড কিংবা অপরাধীর চেহারা এমন দীপ্তিবান হতে পারে না।

‘পরে আমি তাকে বিশ্বাস করি।

এই ইহুদি পণ্ডিত ছিলেন- আব্দুল্লাহ বিন সালাম; যিনি ওই এক ঝলকের আবেশেই ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হন।

নবিজিকে দেখে যদি বড়ো কোনো মানুষের এমন অনুভূতি হয় তাহলে ছোটদের কেমন লাগত, ভাবুন দেখি!

কেমন ছিলো শিশু কিশোরদের চোখে নবিজি

প্রিয় পাঠক

Social Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *