ওষুধ বনাম কাউন্সেলিং কোনটি ভাল কাজ করে prieopathak ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি

কোনটি ভালো কাজ করে ওষুধ বনাম কাউন্সেলিং

বিষণ্ণতা

কোনটি ভালো কাজ করে ওষুধ বনাম কাউন্সেলিং

আপনাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে কেন মিসেস সালেহাকে আমরা ওষুধ দিলাম কিন্তু নীলাকে শুধুমাত্র কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপির কথা বললাম? আমরা সাইক্রিয়াটিস্টরা আসলে কিভাবে সিদ্ধান্ত নেই যে কাকে কোন চিকিৎসা দিয়ে শুরু করবো বা কোন চিকিৎসা চালিয়ে যাব এই অধ্যায় মূলত আমরা ওষুধ এবং কাউন্সেলিং এর তুলনামূলক আলোচনা করব।

প্রথমত বিষন্নতার চিকিৎসায় আমরা ওষুধ এবং কাউন্সেলিং উভয়ই ব্যবহার করে  থাকি যদি অল্প কথায় বলা হয় তবে আমাদেরকে প্রথমেই বিষন্নতার কারণ নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আগের অধ্যায়ে আমরা বলেছি বিষন্নতার জন্য যেমন বায়োলজিক্যাল কারণ দায়ী তেমনি সাইকোলজিকাল কারণ দায়ি হতে পারে অথবা দায়ী হতে পারে উভয়ই। বলা হয়ে থাকে বায়োলজিক্যাল বিষণ্ণতা ওষুধের তুলনামূলক ভালো কাজ করে কিন্তু অপরদিকে সাইকোলজিকাল কারণে বিষন্নতা গুলো হয়ে থাকে সেগুলোর জন্য কাউন্সেলিং সাইকোথেরাপি হলো মূল চিকিৎসা।

বায়োলজিক্যাল বিষন্নতা বলতে মূলত বোঝায় যে বিষণ্ণতার দৃশ্যত তেমন কোনো মারাত্মক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। একে আমরা Endogenous Depression বলে থাকি। আমাদের শরীরে বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার যেমন: সেরোটোনিন, নর এড্রেনালিন, ডোপামিন কমে যাওয়ার কারণে বিষণ্নতা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে সেই নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা বাড়ানো সম্ভব এবং এই জন্যই অভ্যন্তরীণ বিষণ্নতা উপযুক্ত ওষুধে চমৎকার সাড়া দেয়। অপরদিকে সাইকোলজিকাল কারণ যদি আপনার বিষন্নতার জন্য দায়ী হয়ে থাকে অর্থাৎ আপনি কোন বড় ধরনের মানসিক চাপে ভুগছেন বা অন্তর্দ্বন্দ্বে আছেন, তাহলে অবশ্যই সে সমস্যার সমাধান করা আপনার বিষণ্নতা কাটানোর জন্য জরুরী। এই সমাধান আপনি নিজে করতে পারেন অথবা ব্যর্থ হলে অবশ্যই আপনার সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং প্রয়োজন। একে আমরা বলি External Depression। এক্ষেত্রে অনেক সময় সাইকোথেরাপির পাশাপাশি আপনার ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু মূল চিকিৎসার নাইন হবে কাউন্সেলিং। 

ওষুধ বনাম কাউন্সেলিং কোনটি ভালো কাজ করে

আমরা দুটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও ভালোমতো বুঝতে পারবেন। ধরুন আপনার কিছুই ভাল লাগছেনা, কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু আপনি ধরতে পারছেন না কেন আপনার এমন লাগছে। আপনার দৈনন্দিন জীবনে যে টুকটাক সমস্যা নেই তেমনটি নয়। কিন্তু কোন সমস্যাই এত বড় নয় যে আপনার এত খারাপ লাগছে। এক্ষেত্রে আমরা সাধারণত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করে থাকি।

আবার মনে করেন আপনি একটি সম্পর্কে আছেন, যে সম্পর্কে আসলে আপনি থাকবেন নাকি বের হয়ে আসবেন সেটা বুঝতে পারছেন না। ফলে স্বভাবতই আপনি খুব মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছেন অথবা আপনার খুব কাছের একজন ব্যক্তি মারা গেছেন, যা আপনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না! এক্ষেত্রে আমরা মূল অস্ত্র হিসেবে কাউন্সেলিং ব্যবহার করি করে থাকি।

দ্বিতীয়তঃঅনেক সময় এমন একটি পরিস্থিতির শিকার হতে দেখা যায় যে মানসিক চাপের কারণেই বিষন্নতা হচ্ছে, তবুও সাইক্রিয়াটিস্ট আপনাকে ওষুধ দিচ্ছে। সম্ভবত মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এর কারণ কি? আমরা একটু উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি। ধরুন, আপনার ভয়ঙ্কর দাঁতে ব্যথা, যার কারণে ইনফেকশন। এক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি কিন্তু আপনার ব্যথার ওষুধ প্রয়োজন হয়। তা না হলে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করতে যে সময় লাগে সে সময় আপনি ব্যথা সহ্য করতে পারবেন না। মানসিক চাপের কারণে বিষণ্নতা হলেও আমরা তাকে ঠিক এই কারণেই ওষুধ দিয়ে থাকি। কারণ, যে মানুষটি দিনের পর দিন ঘুমাচ্ছেন না অসম্ভব অস্থির হয়ে আছেন বা চাপে আছেন, তার সঙ্গে অনেক সময় কাউন্সেলিং করা সহজ হয় না। সেক্ষেত্রে ওষুধ তাকে অনেকখানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। ফলে থেরাপিস্ট এর পরামর্শ গ্রহণ করা এবং পালন করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়।

তৃতীয়তঃমানসিক কারণ ছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক রোগেও বিষণ্নতা হয়ে থাকে (যেমন, থাইরয়েডের সমস্যা, কুসিং সিনড্রোম ইত্যাদি)। এখন এই রোগ গুলো আপনাকে শারীরিক সমস্যার সমাধান করার পাশাপাশি অবশ্যই বিষন্নতার ওষুধ দিতে হবে। বেশিরভাগ সময় কাউন্সেলিংয়ের এই ব্যক্তির বিষন্নতা ভালো হবে না। 

চতুর্থতআমার কাছে এসে অনেকেই বলেন যে ওষুধ বা কাউন্সেলিং গ্রহণের পরেও আপনার কাঙ্খিত ফলাফল পারছেন না। ওষুধের ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো হতে পারে, তা আমরা আগামী অধ্যায় আলোচনা করব। কিন্তু আমরা এখানে বলব আপনি কেন কাউন্সেলিং নেয়া সত্ত্বেও আপনার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেতে পারেন।

এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য আমরা অনেকেই মনে করি কাউন্সেলিং বলতে শুধু কথা বলা বোঝায়, কিন্তু আসলে বিষয়টি এমন নয়। সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং আসলে এমন একটি শিল্প যার জন্য একজন থেরাপিস্টের অনেক পরিশ্রম করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করতে হয়।

আবার, প্রতিটি ক্লায়েন্টের কাউন্সেলিং, তার জাতি ধর্ম, সংস্কৃতি, মানসিকতা, পারিবারিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন। একজন কাউন্সিলরকে অবশ্যই বুঝতে হবে কার কি ধরনের সাইকোথেরাপি প্রয়োজন।

একদিকে যেমন হতে পারে কাউন্সিলরের পক্ষপাত দুষ্টতা জন্য ক্লায়েন্টের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, অপরদিকে রোগীর নিজের অবহেলার জন্য দায়ী হতে পারে। আমরা বলে থাকি সাইকোথেরাপি ক্ষেত্রে যেমন  কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির ক্ষেত্রে একজন মানুষের ১০ থেকে ১২ টি সেশন এর প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, রোগীর জন্য কখনো এটা প্রায় অসম্ভব কখনো বা ব্যক্তি নিজেই চালিয়ে নিতে চান না আবার কাউন্সেলিং এর ক্ষেত্রে কোন ধরনের সাইকোথেরাপি আপনার প্রয়োজন সেটি জরুরী। যেমন: আপনার কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি কোন প্রয়োজন নেই, সে ক্ষেত্রে যদি আপনাকে চিন্তা শনাক্ত করতে বলা হয় হয়তো আপনার খুব একটা কাজে লাগবে না আবার যখন আপনার সমস্যার সমাধান প্রয়োজন তখন Problem Focused Therapy না করলে কাঙ্খিত ফলাফল আসবে না।

পঞ্চমত:হতে পারে আপনার সমস্যার জন্য ওষুধ এবং কাউন্সেলিং নিয়ে আপনি সামরিক সুস্থতা লাভ করলেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সময়ে আপনার ব্যক্তিত্বের উপর কাজ না করা হলে অনেক সময় বিষন্নতা ফিরে আসতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, তেমনি কিছু দুর্বলতা থাকে। সে দুর্বলতা গুলোকে আমরা কিভাবে কাটিয়ে তুলতে পারে এবং শক্তিশালী দিক গুলোকে নিয়ে জীবনে কিভাবে এগিয়ে যেতে পারি সেটি সাইকোথেরাপির একটি চুম্বক অংশ। আবার আমাদের অনেকেরই ব্যক্তির জনিত কিছু সমস্যা থাকে, যা রোগ থেকে উঠে আসার পথে অন্তরায়।

এজন্য বলা হয় একজন থেরাপিস্ট এর কাজ কখনই ক্লায়েন্টের মন রক্ষা করা নয় বরং আসলে ক্লায়েন্ট এর উপকার কি হবে এবং ক্লায়েন্টের সর্বোচ্চ ভালো হবে কোন জিনিস পরিবর্তন করলে তা দেখিয়ে দেওয়া। কাউন্সেলিং এর ক্ষেত্রে আমি সব সময় একটা কথা বলি আমরা আপনাকে তখন ঐ সাহায্য করতে পারব যদি আপনি পরিবর্তন ও সাহায্য চান।

কোনটি ভালো কাজ করে ওষুধ বনাম কাউন্সেলিং

পরিশেষে, আমার মতে জীবন একটি গাড়ির মতন, যার একটি নির্দিষ্ট রাস্তা আছে। কখনোই সম্পূর্ণ রাস্তা আপনার মনের মত করা সম্ভব নয়। রাস্তায় ভাঙ্গা থাকতে পারে, গর্ত থাকতে পারে কিন্তু যতক্ষণ আপনার গাড়িটি ঠিক আছে ততক্ষণ রাস্তা যেমনই হোক না কেন, আপনি পাড়ি দিতে পারবেন। যদি আপনার গাড়িতে সমস্যা হয় তখন দেখা যাবে ছোটখাটো গর্তে আপনার গাড়িটি আটকে যাবে। আমাদের জীবনে তেমনি চলার পথ কখনো বন্ধুর কখনো মসৃণ। কিন্তু আমরা যদি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি, তবে জীবনের সবকিছুই আমি পার হয়ে যেতে পারবো। যদি আমার নিজের মধ্যেই সমস্যা থাকে তাহলে পথ চলা শুধু কষ্টকর নয় কখনও কখনও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

তাই আপনি সমস্যা অনুভব করলে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ, আপনার সমস্যা নির্ধারণ করার দায়িত্ব একজন সাইক্রিয়াটিক এর এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আপনার কি ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন। আপনার পছন্দ অনুযায়ী আপনি অবশ্যই চিকিৎসক বেছে নিতে পারেন, তবে যাকেই বেছে নেন না কেন তাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করবেন। কারণ রোগ নিরাময়ের জন্য বিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ ।

কোনটি ভালো কাজ করে ওষুধ বনাম কাউন্সেলিং

প্রিয় পাঠক

Social Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *