বিষন্নতার প্রকারভেদগুলো কি কি এক পলকে দেখে নিন prieopathak (প্রিয় পাঠক)

বিষন্নতার প্রকারভেদগুলো কি কি দেখে নিন এক পলকে

বিষণ্ণতা

বিষন্নতার প্রকারভেদগুলো কি কি দেখে নিন এক পলকে

আগেই আমরা আলোচনা করেছি যে, সাইক্রিয়াটিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ মূলত ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন নিয়ে কাজ করেন। ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বলতে শুধু এক ধরনের বিষন্নতায় বোঝায় না, একে কল্পনা করা যায় একটি বিশাল ছাতার সঙ্গে, যার নিচে জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন প্রকার বিষন্নতা।

একজন ক্লায়েন্টের সঙ্গে বসে প্রথমে আমরা চেষ্টা করি মূলত তার বিষন্নতার প্রকারভেদ নির্ণয় করতে। তাদের প্রতিটি বিষন্নতার কারণ যেমন ভিন্ন তেমনি ভিন্ন তাদের চিকিৎসা পদ্ধতিও। আপনারাও পূর্ণ ডায়াগনোসিসের আগে ঢালাওভাবে কখনোই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না যে কার ওষুধ প্রয়োজন, সাইকোথেরাপি প্রয়োজন, বা উভয়ই দরকার।রোগের ভবিষ্যৎ জানার জন্য কোন প্রকার বিষণ্ণতার আওতাভুক্ত তা জানা জরুরী।

) Major Depressive Disorder (MDD):

– এপিসোডিক।

৮০% ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।

– অন্তত ১৪ দিন ব্যাপী মোট নয়টি উপসর্গের মধ্যে পাঁচটি বিদ্যমান থাকতে হবে।

–  মৃদু মাঝারি  বা তীব্র হতে পারে।

– মৃদু: যদি নয়টির মধ্যে যেকোনো পাঁচটি উপসর্গ থাকে।

– মাঝারি: যদি নয়টির মধ্যে যেকোনো ছয় থেকে আটটি উপসর্গ থাকে।

– তীব্র: যদি নয়টির মধ্যে যে কোনো আট থেকে নয়টি উপসর্গ থাকে অথবা আত্মহত্যা প্রবণতা থাকে- চিকিৎসার মাধ্যমে সময়কাল এবং যন্ত্রনা উভয়ই কমিয়ে আনা সম্ভব।

– ওষুধ ভালো কাজ করে, ওষুধের পাশাপাশি তিন থেকে চার সপ্তাহ ওষুধ সেবনের পর কাউন্সেলিং শুরু করা হয়ে থাকে। অনেক সময় শুধুমাত্র মৃদু ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি  দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

) Dysthymia:

– Persistent Depressive Disorder বা Chronic Low-Grade Depression নামে পরিচিত।

– একটানা এবং দীর্ঘমেয়াদী – অন্তত দুই বছরব্যাপী।

– Major Depressive Disorder থেকে স্বল্প মাত্রায়।

– ব্যক্তি নিজে বিষন্নতা অনুভব করতে থাকেন, কিন্তু স্বল্পমাত্রার বলে অনেক সময় আশপাশের মানুষেরা অনুধাবন করতে পারেন না।

– কখনোই আত্মহত্যা প্রবণতা থাকে না।

– কাজে আগ্রহ প্রায় স্বাভাবিক থাকে কিন্তু কাজে আনন্দ কমে যায়।

– কর্মদক্ষতা তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

– প্রায় সবার আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে।

– স্বল্প মাত্রায় ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে তবে সাইকোথেরাপি Dysthymia এর জন্য ১ম লাইনের চিকিৎসা।

– সাধারণত রোগের পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা থাকে এবং Dysthymia দূর করতে হলে ব্যক্তিত্ব নিয়ে কাজ করা জরুরি।

) Double Depression:

– ব্যক্তির Dysthymia_ এর পাশাপাশি কখনো কখনো এপিসোডিক আকারে Major Depressive Disorder দেখা দেয়-তীব্র জ্বর।

–  ওষুধ ও কাউন্সিলিং উভয়ই সমানভাবে প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর।

–  দীর্ঘ সময়ব্যাপী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটানা  বছর চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

) Atypical Depression:

– উপসর্গগুলো স্বাভাবিক বিষণ্ণতার উপসর্গ হতে কিছুটা ভিন্ন।

– একটানা মন খারাপ থাকে না, কখনো ভালো, কখনো খারাপ হতে দেখা যায়, একে Mood Reactivity বলা হয়ে থাকে।

– তীব্র মন খারাপ সকালে না থেকে বিকাল বেলায় থাকে।

– দুশ্চিন্তার উপসর্গগুলো তীব্র থাকে।

– অতিরিক্ত ঘুম হয়।

–  খাওয়ার রুচি বেড়ে যায়।

– হাত-পা ভারী লাগার অনুভূতি থাকতে পারে।

– সমালোচনা সহ্য ক্ষমতা অত্যন্ত কমে যায়

এক্ষেত্রে সাধারণত সাইকোথেরাপি ওষুধ থেকে অধিক কার্যকর।

) Endogenous Depression:

– প্রবীনদের মধ্যে বেশি দেখা যায় তবে মধ্য বয়সেও হতে পারে।

– কোন দৃশ্যত স্ট্রেস পাওয়া যায় না।

– শরীরে নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণের বেশি/কম হওয়া।

– ওষুধমূলক চিকিৎসা ছাড়াও প্রয়োজনে সাইকোথেরাপি লাগতে পারে।

) Post Partum Depression:

– গর্ভকালীন বা প্রসবপরবর্তী সময়ে বহু নতুন মায়ের মধ্যে দেখা যায়।

– যাদের পূর্ব থেকে অথবা আগের প্রেগনেন্সিতে বিষন্নতার ইতিহাস ছিল তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

– পোস্ট-পারটাম বিষণ্ণতার হরমোনের কারণে বা মূল সাইকোলজিকাল কারণগুলো হলো- আমাদের সমাজে মায়েদের নিজেদেরকে নিখুঁত মা হিসেবে দেখতে চাওয়া, পরিবারের ও স্বামীর অসমঝোতা পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, ঘুমের ঘাটতি ইত্যাদি।

ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি দুটোই জরুরী। এক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লেখ্য যে, বিষণ্ণতার অনেক ওষুধ্‌ই গর্ভকালীন বা প্রসব পরবর্তী সময়ে সেবন করা নিরাপদ।

৭) Pre-menstrual Dysphoric Disorder:

– মাসিকের সময়ের সাথে মিল রেখে, আগে বা পরে, মুড সুইং এবং হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিত রাগ হয়।

২০-৪০% নারির মধ্যে দেখা যায়, কিন্তু মাত্র ৫% ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

– জীবন যাত্রার মান পরিবর্তনে মূল চিকিৎসা প্রতিদিন ব্যয়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক খাবার সেবন, পরিমিত ঘুম, মাসিক নিয়মিত করণ এবং মাসিকের আগে পরে অন্তত ২০ মিনিট রোদের আলোতে বসা ইত্যাদি।

– স্বল্প সংখ্যক নারীর ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট সময় ওষুধ সেবনের প্রয়োজন পড়ে।

বিষন্নতার প্রকারভেদগুলো কি কি দেখে নিন এক পলকে

৮) Depression due to Physical illness: 

– দীর্ঘমেয়াদী অধিকাংশ রোগেই বিষন্নতা দেখা যায়।

– এক্ষেত্রে অবশ্যই বিষন্নতা ঠিক করতে হলে শারীরিক রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন।

– যেসব শারীরিক রোগে বিষন্নতা দেখা যায় তাদের মধ্যে প্রধান হল ডায়াবেটিক, হাইপোথাইরয়েডিজম, স্ট্রোক, SLE হার্ট-অ্যাটাক ইত্যাদি।

) Depression due to Drugs:

– শারীরিক রোগের জন্য সেবনকৃত নানা ওষুধ যেমন: কিছু অ্যান্টি-হাইপারটেনন্সিভ, শ্বাসকষ্টের ওষুধ (Theophylline), স্টেরয়েড ইত্যাদি।

– এ সেবনকৃত ওষুধের বিষয়ে অবশ্যই আপনার সাইকিয়াট্রিস্টকে অবগত করুন।

১০) Childhood Depression:

– খিটখিটে ভাব বিরক্তি অস্থিরতা কাজে মনোযোগ এর অভাব মন খারাপ থেকেই বেশি দৃষ্টিগোচর হয়।

–  পারিবারিক কলহ বা চাপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী।

–  মাথাব্যথা, পেটেব্যথা – এসকল উপসর্গ বেশি থাকে।

– সাধারণত প্রাথমিক চিকিৎসা হলো-কাউন্সেলিং।

১১) Bipolar Depression:

– বিষন্নতার পাশাপাশি জীবনকালে একটি হলেও ম্যানিক এপিসোড ছিল/আছে।

– তীব্র, এমনকি অনেক সময় হাসপাতালের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।

– দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার।

– একজন অভিজ্ঞ সাইক্রিয়াট্রিস্ট দ্বারা চিকিৎসা করা আবশ্যক।

কারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

ক. যাদের কিশোর বয়সেই বিষন্নতার আবির্ভাব ঘটে।

খ. যার পরিবারে বাইপোলার ডিসঅর্ডার এর ইতিহাস বিদ্যমান।

গ. যাদের বিষন্নতার সঙ্গে তীব্র মুড সুইং হয়।

ঘ. যাদের বিষন্নতার ওষুধ সেবনেও কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।

১২) Winter Depression/Seasonal Depression:

–  মূলত শীতকালে আলোর অভাবে হয়ে থাকে।

– শীতপ্রধান দেশে বেশি দেখা যায়।

– ঘরে আলোর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া এবং দৈনিক ২০ মিনিট করে (সকাল টা থেকে টার মধ্যে), সপ্তাহে ১০০ মিনিট সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকা চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।

১৩) Depression due to Addication:

– দীর্ঘদিন গাঁজা-ইয়াবা সেবনের ফলে বিষন্নতা দেখা যায়।

– নেশা দ্রব্য সেবন ত্যাগ করলে অধিকাংশ সময়ই এই বিষন্নতার উন্নতি ঘটে।

১৪) Old Age Depression:

– প্রবীনদের চাকরি থেকে অবসরের পর, সন্তান বড় হয়ে গেলে, একাকীত্বের কারণে বিষন্নতা হয়ে

থাকে।

– প্রেীঢ়দের মধ্যে মনোপোজের পরে বিষন্নতা খুব সাধারণ।

– মূল চিকিৎসা কাউন্সেলিং, খুব অল্প ক্ষেত্রে ওষুধ লাগতে পারে।

আমাদের সমাজে মূলত এই ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনগুলোই বেশি পেয়ে থাকি। এদের মধ্যে অধিকাংশ চিকিৎসায় প্রায় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যায়, খুবই অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়ে থাকে।

বিষন্নতার প্রকারভেদগুলো কি কি দেখে নিন এক পলকে

প্রিয় পাঠক

Social Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *